#রিয়াদুস_সালেহীন প্রথম খণ্ড

Muhammads words
0

#রিয়াদুস_সালেহীন প্রথম খণ্ড

বিসমিল্লা'হিররাহমানির রাহিম।

রিয়াদুস সালেহীন

ইমাম মুহিউদ্দীন ইয়াহইয়াহ আন-নববী (রহ)

[প্ৰথম খণ্ড]

অনুবাদে মাওলানা সাইয়েদ মুহাম্মাদ আলী

মাওলানা মুহাম্মদ মূসা মাওলানা শামছুল আলম খান

সম্পাদনায়

মাওলানা আবদুল মান্নান তালিব মাওলানা মোঃ আতিকুর রহমান মাওলানা মুহাম্মদ মূসা

বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার ঢাকা

প্রকাশক

ড. মোহাম্মদ শফিউল আলম ভূঁইয়া পরিচালক

বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার

২৩০ নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫

ফোন : ৫৮৬১২৪৯১, Fax : ০২-৯৬৬০৬৪৭

সেলস এন্ড সার্কুলেশান

কাঁটাবন মসজিদ ক্যাম্পাস ঢাকা-১০০০

ফোন : ৫8612482, 01932853670

Web : www.bicdhaka.com  ই-মেইল : info@bicdhaka.com 

ISBN : 984-31-0855-8 set

প্রথম প্রকাশ

জুন ১৯৮৫

২৮ তম প্রকাশ

রবিউল আউয়াল ১৪৩৭

মুদ্রণে

আল ফালাহ প্রিন্টিং প্রেস

মগবাজার, ঢাকা-১২১৭

বিনিময় মূল্য : দুইশত টাকা

অগ্রহায়ণ ১৪২२

ডিসেম্বর ২০১৫

Riyadus Saleheen (Vol. I ) Published by Dr. Mohammad Shafiul Alam Bhuiyan Director Bangladesh Islamic Centre 230 New Elephant Road Dhaka- 1205 Sales and Circulation Katabon Masjid Campus Dhaka-1000 1st Edition June 1985, 28th Edition December 2015, Price Taka 200.00 only.


প্রসঙ্গ কথাঃ

প্রায় সাড়ে চৌদ্দ শত বছর পরেও আল কুরআন সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত ও অবিকৃত অবস্থায় আমাদের সামনে রয়ে গেছে। ঠিক তেমনি হাদীসের ব্যাপারেও পরিপূর্ণ জোরের সাথে এ কথা বলা যায় । হাদীস বিকৃত করার বহুতর অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। কিন্তু উম্মাতে মুহাম্মাদী অসাধারণ পরিশ্রম, আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও ত্যাগের বিনিময়ে সত্য, নির্ভুল ও যথার্থ হাদীসগুলোকে বাছাই করে সংরক্ষিত রাখতে সক্ষম হয়েছে। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উম্মাত ছাড়া অন্য কোনো নবীর উম্মাত তাদের নবীর সমগ্র জীবন প্রণালী, বাণী, কার্যক্রম, কর্মতৎপরতা এবং তাঁর প্রতি মুহূর্তের চলাফেরা, প্রতিটি পদক্ষেপ ও সিদ্ধান্ত এমন নিষ্ঠা সহকারে নির্ভুলভাবে সংরক্ষণ করার চেষ্টা করেনি। রাসূলে পাক (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জীবনকাল থেকে হাদীস লেখা হতে থাকে। তাঁর তিরোধানের দুই-তিন শত বছরের মধ্যেই সমস্ত হাদীস যাচাই হয়ে নির্ভুলভাবে লিপিবদ্ধ হয়ে আসে । প্রথম দিকে তাবিঈ ও তাবে তাবিঈগণ বিভিন্ন বিষয় ভিত্তিতে পৃথক পৃথক গ্রন্থাকারে হাদীস লিপিবন্ধ করতে থাকেন। এগুলোকে জামে ও সুনান বলা হয়। এভাবে অনেকগুলো মৌলিক হাদীসগ্রন্থ রচিত হয়। এরপর একদল মুহাদ্দিস এগিয়ে আসেন। তাঁরা কেউ সাহাবীদের নাম অনুসারে হাদীসগুলোকে সাজান এবং এক একজন সাহাবী বর্ণিত হাদীসগুলোকে এক এক অধ্যায়ে স্থান দেন। আবার কেউ নিজের উস্তাদ অর্থাৎ সর্বশেষ রাবীর নাম অনুসারে হাদীসগুলো সাজান। আবার একদল মুহাদ্দিস এক এক বিষয়ের হাদীসগুলো এক একটি বিভাগে লিপিবদ্ধ করেন। এগুলোকে বলা হয় যথাক্রমে মুসনাদ, মু'জাম ও রিসালাহ। এগুলো সবই হাদীসের মৌলিক গ্রন্থ। অতঃপর একদল মুহাদ্দিস বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য হাদীস গ্রন্থ থেকে বিষয় ভিত্তিক হাদীস সংকলন করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। এই সংকলনগুলির মধ্যে ইমাম নববীর রিয়াদুস সালেহীন অনন্য সাধারণ মর্যাদার অধিকারী রিয়াদুস সালেহীনের বৈশিষ্ট্য।


ইমাম নববী (রাঃ) তাঁর দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে এ গ্রন্থটি প্রণয়ন করেন। সিহাহ সিত্তাহসহ আরো কয়েকটি প্রথম পর্যায়ের নির্ভরযোগ্য হাদীস গ্রন্থ থেকে তিনি এই হাদীসগুলো আহরণ করেছেন। রিয়াদুস সালেহীনে কোনো প্রকার 'যঈফ' হাদীসের স্থান নেই। এক একটি বিষয়ের হাদীসের জন্য এক একটি অনুচ্ছেদের শুরুতে প্রথমে উল্লেখিত বিষয় সম্পর্কিত আল কুরআনের বিভিন্ন আয়াত সংযুক্ত করা হয়েছে, তারপর উদ্ধৃত হয়েছে সেই বিষয় সম্পর্কিত প্রামাণ্য হাদীসগুলো। হাদীসের শেষে হাদীসের নির্ভরযোগ্যতা কোন পর্যায়ের তা বর্ণনা করা হয়েছে এবং এই সংগে হাদীসের কিছুটা ব্যাখ্যাও সংযুক্ত করা হয়েছে।


আমাদের জীবনের দৈনন্দিন বিষয়গুলো সম্পর্কিত চমকপ্রদ হাদীসগুলো এমন যাদুকরী পদ্ধতিতে এখানে সংযোজিত হয়েছে যার ফলে সেগুলো অধ্যয়ন করার সাথে সাথেই মনোযোগী পাঠকের মনের গভীরতম প্রদেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং কোনো আগ্রহী পাঠক তার প্রভাব গ্রহণ না করে থাকতে পারেনা।


অধ্যায়ের শুরুতে আল কুরআনের আয়াত এবং তারপর বিষয় সংশ্লিষ্ট হাদীসের বর্ণনা থেকে বুঝা যায় যে, আল কুরআনের সাথে হাদীসের সম্পর্ক কত গভীর। হাদীস যে আল কুরআনেরই ব্যাখ্যা এ কথা সুস্পষ্টভাবে এখানে প্রমাণিত হয়। হাদীসের সাহায্য ছাড়া আল কুরআনের সঠিক অর্থ অনুধাবন করা সম্ভব নয় এবং আল কুরআনের মৌল বিধানসমূহের প্রায়োগিক পদ্ধতি হাদীসেই বিধৃত হয়েছে। আল কুরআনের আয়াতের পরপরই হাদীসগুলোকে সাজাবার মাধ্যমে লেখক এ বিষয়টি পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছেন। এটি এ কিতাবের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।


এ গ্রন্থে ইমাম নববী (র) আল কুরআনের ৪২৩টি আয়াত এবং ১৯০৩টি হাদীস সংযোজিত করেছেন। বিষয়বস্তু বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তিনি বৈশিষ্ট্যের স্বাক্ষাত রেখেছেন। এমন সব বিষয়বস্তু সম্বলিত হাদীস এখানে সংযোজিত করেছেন, যার সাহায্যে একজন সাধারণ শিক্ষিত ও কম শিক্ষিত পাঠক থেকে শুরু করে উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তি পর্যন্ত সবাই এ থেকে সমভাবে লাভবান হতে পারেন। কারণ এখানে তিনি নৈতিক চরিত্র গঠন থেকে শুরু করে মুসলিম ও মুমিন জীবনের বহিকাঠামোর যাবতীয় দিক, তার সমস্ত আমল-কার্যাবলীর সঠিক দিক নির্ণয় ও সুষ্ঠু সম্পাদন এবং তার অন্তরের পবিত্রতা বিধান ও মানসিক পরিশুদ্ধ বিষয়গুলির সমাবেশ ঘটিয়েছেন। এ কিতাবটি একজন মানুষের মানবিক বৃত্তিগুলির লালন ও পরিচর্যা করে এ কিতাব অধ্যয়ন করার পর একজন পাঠক তা সহজেই অনুধাবন করতে পারবেন। নিয়ত সম্পর্কিত হাদীসে জিবরীলে যে বিষয়ের প্রতি সূক্ষ্ম ইংগিত করা হয়েছে, একজন মুমিনের সমস্ত ইবাদত- বন্দেগী ও আল্লাহ্র সাথে পুংখানুপুং উপস্থাপনা এ হাদীস সংকলনটির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। যেমন: মুরাকাবা, মুজাহাদা, মুহাসাবা, তাওবা, তাওয়াক্কুল, ইখলাস, সিক, পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার, নিকটাত্মীয়ের সাথে সুসম্পর্ক, তাকওয়া, আল্লাহ সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা, ঈমানের ব্যাপারে আশা-আকাংখা ইত্যাদি বিষয়গুলো স্বতন্ত্র অনুচ্ছেদের মাধ্যমে সুস্পষ্ট করে তুলে ধরা হয়েছে। তাই বিজ্ঞ আলিমগণের মতে ইমাম নববীর শ্রেষ্ঠ গ্রন্থগুলির মধ্যে সহীহ মুসলিমের ব্যাখ্যা গ্রন্থটির পর রিয়াদুস সালেহীনের স্থান।


হাদীসের কতপিয় পরিভাষা ও হাদীসের প্রকারভেদ।

হাদীসের বিষয়বস্তু হচ্ছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখ নিঃসৃত কথা অথবা তাঁর সম্পর্কে কোনো সাহাবীর কথা, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাজ, যে কাজ তিনি নিজে করেছেন অথবা কোনো সাহাবী করেছেন এবং তিনি সমর্থন বা অসমর্থন করেছেন; রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর কোনো অনুভূতি, অভ্যাস বা আকাঙ্ক্ষার অভিব্যক্তি। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে এই সমস্ত কিছু বর্ণনার মূল দায়িত্ব সাহাবায়ের কেরামের । সাহাবীগণ রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কিত কোন বিষয় লুকিয়ে রাখেননি। যেহেতু আল কুরআনে বলা হয়েছে :

مَا الكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا -

“রাসূল তোমাদেরকে যা কিছু দিয়েছে তা গ্রহণ কর এবং যা কিছু থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করেছে তা থেকে দূরে থাক”। এ বিধানের উপর সাহাবীগণ পুরোপুরি আমল করেছেন। তাঁরা যেমন তাঁর সাথে সম্পর্কিত প্রতিটি বিষয় গুরুত্ব সহকারে জানার, বুঝার ও আয়ত্ত করার ব্যবস্থা করেন, তেমনি গুরুত্ব ও যত্ন সহকারে সেগুলো ভবিষ্যত বংশধরদের কাছে হস্তান্তরিত করারও দায়িত্ব নেন। এ ব্যাপারে তাঁরা একটুও গড়িমসি, বাড়াবাড়ি, গাফলতি বা কল্পনার আশ্রয় নেননি। কারণ তাঁরা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর এ বাণীটি সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়াকিফহাল ছিলেন যাতে বলা হয়েছে : “যে ব্যক্তি সজ্ঞানে আমার উপর মিথ্যা আরোপ করে সে যেন জাহান্নামে তার আবাস ঠিক করে নেয়।” (সহীহ মুসলিম)


যে জিনিসটি তারা যে ভাবে জেনেছেন বা শুনেছেন সেটি ঠিক হুবহু সেভাবেই বর্ণনা করেন । হাদীসের ব্যাপারে এ ধরনের সত্য কথনকে হাদীসের পরিভাষায় বলা হয় 'আদালত'। মুহাদ্দিসগণ এ ব্যাপারে একমত যে, হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে সাহাবীগণ কোন প্রকার মিথ্যার আশ্রয় নেননি । তাই তাঁদের সর্বস্বীকৃত মত হচ্ছে : 'je is a “সকল সাহাবীই আদিল" অর্থাৎ সত্যবাদী। সাহাবীদের পরে হাদীস বর্ণনা ও সংরক্ষণের দায়িত্ব নেন তাবিঈগণ (সাহাবীদরে অনুসারীগণ) এবং তাঁদের পরে তাবে-তাবিঈগণ (তাবিঈগণের অনুগামীগণ)। এভাবে এ সিলসিলাটি নিচের দিকে চলে এসেছে। সাহাবীদের পরবর্তী পর্যায়ে 'আদিল' ও 'আদালত' শব্দটি যখন কোন রাবী বা বর্ণনাকারীর সাথে লাগানো হয়েছে তখন তার মধ্যে পাঁচটি গুণ অবশ্যি পাওয়া গেছে। এ গুণগুলো হচ্ছে ঃ এক.. রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর হাদীস সম্পর্কে তিনি কখনো মিথ্যা বলেন নি। দুই. দুনিয়ার জীবনে সাধারণ কাজ-কারবারেও তিনি কখনো মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত হন নি। তিন, তিনি এমন কোন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি নন, যার জীবন সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি, যার ভিত্তিতে তাঁর জীবন ধারা পর্যালোচনা করা সম্ভব। চার. ব্যক্তিগত ও সমাজ জীবনে তিনি ফাসিক নন। অর্থাৎ তিনি এমন ব্যক্তি যিনি মুসলিম এবং নিজের জীবনে ইসলামের অনুশাসনসমূহ তথা ফরয ও সুন্নাহর অনুসারী। কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী কোন প্রকার আকীদা অথবা কুরআন, সুন্নাহ ও সাহাবীদের জীবনে নেই, ইবাদাত-বন্দেগীর ক্ষেত্রে এমন কোন 'বিদআত' তথা নতুন কথা ও কাজ উদ্ভাবন করে বা উদ্ভাবিত কথা ও কাজকে তিনি দীনের অংশ হিসেবে মেনে চলেন না।


বর্ণনাকারীদের মধ্যে আদালতের গুণের সাথে সাথে আর একটি গুণকে মুহাদ্দিসগণ অপরিহার্য পণ্য করেছেন, সেটি হচ্ছে : 'যরত'। স্মৃতির ধারণক্ষমতাকেই যত বলা হয়। অর্থাৎ বর্ণনাকারীর স্মৃতিশক্তি এমন পর্যায়ের হতে হবে যাতে তিনি কোন দ্রুত বা লিখিত বিষয় যে কোন সময় হুবহু ও সঠিকভাবে স্মরণ করতে সক্ষম হন এবং তাঁর স্মৃতি থেকে তার কোন অংশ উধাও না হয়ে যায়। এই ধরণের স্মৃতিশক্তির অধিকারী রাবীকে বলা হয় যাবিত। যে রাবীর মধ্যে আদালত ও যত গুণাবলী পূর্ণ মাত্রায় বিরাজমান থাকে তাকে বলা হয় 'সিকাহ' রাবী। হাদীস বর্ণনাকারীদের বলা হয় 'রাবী' এবং এই রাবীদের সিলসিলা অর্থাৎ সাহাবী এবং সাহাবী থেকে তাবিঈ, তাবিঈ থেকে তাবি-তাবিঈ, তারপর তাবে-তাবিঈদের থেকে তৎপরবর্তী বর্ণনাকারী- এই সমগ্র সিলসিলাটিকে (Chain) বলা হয় সনদ।


মুহাদ্দিসগণ হাদীসকে কয়েকটি শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন। এই সমস্ত বিভক্তি হয়েছে হাদীসের সনদ ও রাবীর ভিত্তিতে। যে হাদীসের সনদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছেছে এবং সেটি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর হাদীস হিসেবে গৃহীত হয়েছে তাকে বলা হয় 'মারফূ' হাদীস। যে হাদীসের সনদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছেনি, বরং কোন সাহাবী পর্যন্ত পৌঁছেছে এবং সেটি সাহাবীর হাদীস হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে, তাকে 'মওকৃষ্ণ' হাদীস বলা হয়। এর অন্য নাম হচ্ছে- আসার। বলাবহুল্য দীন ও শরীয়াতের মৌলিক বিষয়ে কোন সাহাবী নিজের পক্ষ থেকে কিছু বলতে পারেন না, অবশ্যি তিনি তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে শুনেছেন কিন্তু যে কোন সংগত কারণে তা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর সাথে সম্পর্কিত করেননি। এজন্য মওকৃষ্ণ হাদীসকেও সহীহর মধ্যে গণ্য করা হয়। যে হাদীসের সনদ কোন তাবিঈ পর্যন্ত পৌঁছে শেষ হয়ে গেছে এবং সেটি ভাবিঈর হাদীস হিসেবে গৃহীত হয়েছে, তাকে বলা হয় 'মাক্তু' হাদীস । মা গ্রহণ যোগ্য নয়।


যে হাদীসের সনদের মধ্যে কোন স্তরে কোন রাবীর নাম বাদ পড়েনি এবং প্রত্যেকের নাম যথাস্থানে উল্লেখিত হয়েছে তাকে বলা হয় 'মুত্তাসিল' হাদীস। আর যে হাদীসের সনদের মধ্যে কোন স্তরে কোন রাবীর নাম অনুল্লেখ থাকে তাকে বলা হয় 'মুনকাতে হাদীস। মুনকাতে হাদীস আবার দুই প্রকারঃ ‘মুরসাল' ও 'মুআল্লাক'। যে হাদীসের সনদের শেষের দিকের রাবী অর্থাৎ সাহাবীর নাম বাদ পড়ে এবং তাবিঈ সারাসরি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে হাদীস বর্ণনা করেন তাকে মুরসাল হাদীস বলা হয়। ইমাম আবু হানীফা (রাঃ) ও ইমাম মালিক (রাঃ) মুরসাল হাদীস নিঃসংশয়ে গ্রহণ করেছেন। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রাঃ)-ও রায় এর মুকাবিলায় মুরসাল হাদীস গ্রহণ করেছেন এবং এর ভিত্তিতে ফতোয়া দিয়েছেন। যে হাদীসের সনদে সাহাবীর পর এক বা একাধিক রাবীর নাম বাদ পড়ে তাকে বলা হয় 'মুআল্লাক' হাদীস। মুআল্লাক হাদীস গ্রহণযোগ্য নয় । যে মুত্তসিল হাদীসের সনদের প্রত্যেক রাবীই পূর্ণ 'আদালত' ও 'যত্ত' গুণের অদিকারী এবং যা বর্ণনার সকল প্রকার দোষ- ত্রুটিমুক্ত তাকে বলা হয় 'সাহীহ' হাদীস। যে হাদীসের রাবীর 'যত' গুণে পরিপূর্ণতার অভাব রয়েছে তাকে বলা হয় 'হাসান' হাদীস। ফকীহগণ সাধারণত আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে এই সাহীহ ও হাসান হাদীসের উপরই নির্ভর করে থাকেন।


যে হাদীরেস রাবী হাসান হাদীসের গুণসম্পন্ন নন অর্থাৎ যার মধ্যে 'যত' গুণের অভাব রয়েছে তাকে বলা হয় 'যঈফ' হাদীস। যঈফ হাদীসের দুর্বলতা রাবীর দুর্বলতার ফল। অন্যথায় 'মতন' (মূল পাঠ)- এর কারণে তার মধ্যে কোন দুর্বলতা আসতে পারে না। যে হাদীসের রাবী জীবনে কখনো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে ইচ্ছা করে মিথ্যা বলেছে বা রচনা করেছে বলে স্বীকৃত হয়েছে তার বর্ণিত হাদীসকে বলা হয় 'মওযূ' হাদীস। এ ধরনের হাদীস কোনক্রমেই গ্রহনযোগ্য নয়।


যে সাহীহ হাদীসটি প্রত্যেক যুগে এত বিপুল সংখ্যক রাবী রিওয়ায়াত করেছেন, যাদের পক্ষে একই সময় একই স্থানে সমবেত হয়ে কোন মিথ্যা রচনা করা অসম্ভব, তাকে বলা হয় 'মুতাওয়াতির হাদীস। মুতাওয়াতির হাদীসের সাহায্যে ইলমে ইয়াকীন (পূর্ণ প্রত্যয়সূচক জ্ঞান) লাভ করা যায়, যার মধ্যে সংশয় ও সন্দেহের লেশমাত্রও থাকে না। যে সাহীহ হাদীসটি প্রতি যুগে অন্তত তিনজন রাবী রিওয়ায়াত করেছেন তাকে বলা হয় 'মশহুর হাদীস। যে সহীহ হাদীসকে প্রতি যুগে অন্তত দু'জন রাবী রিওয়ায়াত করেছেন তাকে বলা হয় 'আযীয' হাদীস। আর যে সহীহ হাদীসটি কোন যুগে মাত্র একজন রাবী রিওয়ায়াত করেছেন তাকে বলা হয় 'গরীব' হাদীস। এই শেষোক্ত তিন প্রকারের হাদীসকে একসাথে ‘খবরে ওয়াহিদ' বলা হয়। খবরে ওয়াহিদের কোন পর্যায়ে বা স্তরে রাবীর সংখ্যা কম হবার কারণে তা মুতাওয়াতিরের সমপর্যায়ের ইলমে ইয়াকীন লাভে সাহায্য করে না। কিন্তু তাই বলে তার রাবীর মধ্যে 'যত' গুণের কোন অভাব নেই। ফলে তা 'যাঈফ' হাদীসের পর্যায়ভুক্ত নয়। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে একই হাদীসকে হাসান- সহীহও বলা হয়। এর কারণ কয়েকটি হতে পারে ঃ এক. অনেকের মতে এটা কেবলমাত্র ইমাম তিরমিযীর নিজস্ব একটি পরিভাষা। দুই. হাদীসটি দুই সনদে বর্ণিত হয়েছে। এর একটি সনদ সহীহ এবং অন্যটি হাসান। তিন, হাদীসটি এখানে শাব্দিক অর্থে হাসান এবং পারিভাষিক অর্থে সহীহ। চার. হাদীসটি উচ্চতর গুণগত দিক দিয়ে (অর্থাৎ স্মৃতি ও সংরক্ষণ ক্ষমতা এবং প্রত্যয় গুণ) সহীহ এবং নিম্নতম গুণের (অর্থাৎ সত্যতার) দিক দিয়ে হাসান। পাঁচ. হাদীসটির মধ্যে সহীহ ও হাসান গুণ সমপর্যায়ভূক্ত। ছয়. হাদীসটি সনদের দিক দিয়ে হাসান এবং বিষয়বস্তুর দিক দিয়ে সহীহ। সাত. হাদীসটি হাসান লিযাতিহী এবং সহীহ লিগাইরিহী। অর্থাৎ হাদীসটি নিজের সত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট গুণাবলীর কারণে হাসান এবং সত্তার বাইরের প্রভাবে সহীহ যেমন ধরুন, হাদাসটি বিভিন্ন সনদে বর্ণিত হয়েছে কিন্তু কোনটিই পূর্ণতার পর্যায়ভুক্ত না হবার কারণে তা হাসানের অন্তর্ভূক্ত আবার অসংখ্য সনদের কারণে তার মধ্যে বাইরে থেকে সহীহ্ গুণ সৃষ্টি হয়ে গেছে।


ইমাম নববী (রাঃ)-এর জীবন বৃত্তান্ত

ইমাম নববীর পুরো নাম ও বংশানুক্রম হচ্ছে: মুহীউদ্দীন আবু যাকারিয়া ইয়াহ্ইয়া ইবনে শারাফ ইবনে মারী ইবনে হাসান ইবনে হুসাইন ইবনে মুহম্মাদ ইবনে জামাই ইবনে হিযাম আন-নববী। তাঁর মূল নাম হচ্ছেঃ ইয়াহ্ইয়া, ডাকনাম আবু যাকারিয়া এবং উপাধি মুহিউদ্দীন।


হিজরী ৬৩১ সনের মুহাররাম মাসে দামিশকের সন্নিকটে নবী নামক জনপদে তাঁর জন্ম। শৈশবকাল তাঁর নিজের পল্লীতে অতিবাহিত করেন। তাঁর লেখা-পড়ার গুরুও এখানেই হয়। আরবী বর্ণমালা শিক্ষা, আল কুরআন তিলাওয়াত ও হিফযুল কুরআনের মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর শিক্ষা জীবনের উদ্বোধন করেন। শৈশব ও কৈশোরে খেলাধূলার প্রতি তাঁর কোন মনোযোগই ছিল না। সমবয়সী ছেলেরা তাঁকে খেলার জন্য আহবান করলে তিনি তাদের সাথে যেতেন না এবং তারা এজন্য পীড়াপীড়ি করলে তিনি কেঁদে ফেলতেন। যৌবনের প্রারম্ভে পিতা তাঁকে নিজের সাথে ব্যবসায়ে লাগাবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। পিতা অনুভব করেন পুত্র যাকারিয়ার মধ্যে জ্ঞানার্জনের ব্যাকুলতা। পুত্রের উন্নত মানসিক বৃত্তি ও অসাধারণ ধীশক্তি তাঁকে অনুপ্রাণিত করে। তিনি পুত্রের উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে তাকে নিয়ে তৎকালী জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্র দামিশকে চলে আসেন। এখানে ইমাম নববী প্রসিদ্ধ উস্তাদ কামাল ইবনে আহমাদের কাছে শিক্ষা লাভ করতে থাকেন।


এ সম্পর্কে ইমাম নববী (রাঃ) নিজেই লিখেছেনঃ “আমার বয়স যখন ১৯ বছর তখন আব্বাজান আমাকে দামিশকে নিয়ে গেলেন। সেখানে পৌঁছে আমি রওয়াহা মাদ্রাসায় ভর্তি হলাম। দুই বছর এখানেই অবস্থান করলাম। খাবার-দাবারের ব্যবস্থা ছিল মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে"। জ্ঞানানুশীলনের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ উস্তাদদেরকেও তাঁর প্রতি আকৃষ্ট করে। ৬৫০ হিজরীতে তিনি পিতার সাথে হজ্জে যান এবং দেড় মাস মদীনা মুনাওয়ারায় অবস্থান করেন। আতাউদ্দীন ইবনে আতা বর্ণনা করেন, শায়খ নববী তাঁকে বলেছেন যে, তিনি নিজের উত্তাদের কাছে প্রতিদিন ১২টি বিষয় পড়তেন। তার মধ্যে প্রধান বিষয়গুলো ছিলঃ আল-জাম্‌উ বাইনাস সহীহাইন, সহীহ মুসলিম, নাহু, সরফ, মানতিক, উসূলে ফিক্হ ও আসমাউর রিজাল। স্মরণশক্তিও তাঁর ছিল অসাধারণ। ফলে কোন বিষয় একবার পড়লে তা তাঁর স্মৃতিপটে অক্ষয় হয়ে থাকত। হাদীস ও ফিকহের জ্ঞানানুশীলনের মধ্যে তিনি আত্মার তৃপ্তি অনুভব করতেন। তিনি নিজের যুগের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসদের থেকে হাদীসের জ্ঞান লাভ করেন এবং একই সাথে ফিক্হ উসূলে ফিক্হ ও মানতিকেও পারদর্শিতা অর্জন করেন।


ইবাম নববী বহুসংখ্যক উস্তাদের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। তাঁর কয়েকজন শ্রেষ্ঠ উস্তাদের নাম দেয়া হলঃ ১. আবু ইবরাহীম ইসহাক ইবনে আমহদ আল মাগরিবী; ২. আবু মুহাম্মদ আবদুর রহমান ইবনে নূহ আল-মাকদিসী; ৩. আবু হাফস উমার ইবনে আসআদুর রিবা: ৪ আবুল হাসান।


আরশিলী; ৫. আবু ইসহাক ইবরাহীম মুরাদী; ৬. আবুল বাকা খালিদ ইবনে ইউসুফ নাবিসী: ৭. দিয়া ইবনে তাম্মাম হানাফী; ৮. আবুল আব্বাস আহমাদ মিসরী; ৯. আবু আবদিল্লাহ জিয়ানী; ১০. আবুল ফাহ উমার ইবনে বুন্দার; ১১. আবু ইসহাক ওয়াসিতী; ১২. আবুল আব্বাস মাকদিসী; ১৩. আবু মুহম্মাদ তানূখী; ১৪. আবু আবদির রহমান আনবারী; ১৫. আবুল ফারাজ মাকদিসী ও ১৬, আবু মুহম্মদ আনসারী ।

৬৭৬ হিজরীতে বাইতুল মাকদিস সফরশেষে নিজ গ্রামে ফিরে এসেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় ১৪ রজব বুধবার রাতে ইস্তকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।


ইমাম নববী (রাঃ) তাঁর ৪৫ বছরের জীবনকালে অসংখ্য মূল্যবান গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন। এর মধ্যে কয়েকটির নামঃ ১. সহীহ বুখারীর শারহে কিতাবুল ঈমান অর্থাৎ সহীহ বুখারীর কিতাবুল ঈমান অধ্যায়ের ব্যাখ্যা গ্রন্থ। ২. আল-মিনহাজ ফী শারহে মুসলিম ইবনিল হাজ্জাজ অর্থাৎ মুসলিম শরীফের ব্যাখ্যা। এ গ্রন্থটি সম্পর্কে ইমাম নববী নিজেই বলেছেনঃ 'যদি বই দীর্ঘায়িত করার ফলে আমার শক্তি হ্রাস ও পাঠকবৃন্দের সংখ্যাল্পতা দেখা দেবার আশংকা না থাকত তাহলে এ বইটি আমি একশো খণ্ডে শেষ করতাম। সবদিক বিবেচনা করে একে আমি মাঝামাঝি আকারেই রেখেছি। বর্তমানে আরবীতে গ্রন্থটি দুই খণ্ডে ছাপা হয়। ৩. রিয়াদুস সালেহীন। ৪. কিতাবুর রওদাহ। এটি শারহে কবীর রাফিঈ গ্রন্থের সংক্ষিপ্ত রূপ। ৫. শারহে মুহায্যাব। ৬. তাহযীবুল আসমা ওয়াস সিফাত । ৭. কিতাবুল আযকার। ৮. ইরশাদ ফী উলুমিল হাদীস। ৯. কিতাবুল মুবহামত। ১০. শারহে সহীহ বুখারী অর্থাৎ সহীহ বুখারীর ব্যাখ্যা। ১১. শারহে সুনানে আবী দাউদ অর্থাৎ আবু দাউদের ব্যাখ্যা। ১২. তাবাকাতে ফুকাহায়ে শাফিঈয়া। ১৩. রিসালাহ ফী কিসমাতিল গানাইম। ১৪. ফাতাওয়া । ১৫. জামিউস সুন্নাহ। ১৬. খুলাসাতুল আহকাম। ১৭. মানাকিবুশ শাফিঈ। ১৮. বুস্তানুল আরিফীন। ১৯. মুখতাসার উসুদুল গাবাহ। ২০. রিসালাতু ইসতিবাবিল কিয়াম লি আহলিল ফাল। ইমাম নববী রহমাতুল্লাহি আলাইহি কেবল একজন আলিম ও মুহাদ্দিস হিসেবেই খ্যাত ছিলেন না, তাঁর উন্নত চরিত্র, তাকওয়া ও আনড়ম্বর জীবন যাপন সমকালীন ইসলামী সমাজে আদর্শ হিসাবে গৃহীত হয়েছিল। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জীবন-যাপন প্রণালীকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে তিনি অত্যন্ত সাদামাটা আহার করতেন এবং মোটা কাপড় পরতেন। শিক্ষিত- অশিক্ষিত, আমীর-গরীব সবাই তাকে সম্মান করতেন। কিন্তু দুনিয়ায় এত সম্মান লাভ করার পরও তিনি কখনো অর্থ, সম্মান, পদ ও ক্ষমতার পেছনে ছোটেননি। সারাজীবন তিনি কখনো সরকারী অর্থ ও সহায়তা গ্রহণ করেননি। কারো থেকে কোন দান গ্রহণ করেননি। সারা দিন কেবল ইসলামের প্রচার ও প্রসারে ব্যয় করতেন অথবা ইবাদাত-বন্দেগী করতেন। সারা দিন-রাতের মধ্যে মাত্র একবার খেতেন, তখনি পানি খেতেন। তার ছাত্রসংখ্যা ছিল অসংখ্য। ইমামের ছাত্রদের মধ্যে অনেকেই পরবর্তী কালে খ্যাতি অর্জন করেন।


প্রারম্ভিক কথা ইমাম নববী (রাঃ)

আল্লাহ তাআলার জন্য যাবতীয় প্রশংসা। তিনি এক ও অদ্বিতীয়, মহান পরাক্রমশালী ও অপরাধ মার্জনাকারী। তিনি রাত ও দিনের আবর্তনকারী। চিন্তাশীল ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন লোক যেন তা থেকে উপদেশ গ্রহণ করেন। তিনি তাঁর সৃষ্টিকুলের মধ্যে যাকে চান জাগ্রত করেন, উদ্যোগী বানিয়ে দেন। তিনি তাকে গভীর চিন্তা ও ধ্যানে মশগুল করেন, তাকে নসীহত গ্রহণ করার যোগ্যতা দান করেন, আনুগত্যের উপর অটল রাখেন এবং আখিরাতের জন্য প্রস্তুতির সৌভাগ্য দান করেন। তিনি তাকে গযব ও জাহান্নামের পথ থেকে দূরে রাখেন এবং যে কোন অবস্থায় সত্য-ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার যোগ্যতা দান করেন।

আমি তাঁর সমস্ত গুণাবলীর পূর্ণ অর্থবোধক ও পবিত্রতম শব্দ দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রশংসা করছি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। আমাদের একমাত্র শ্রেষ্ঠ নেতা মুহাম্মাদ (সা) আল্লাহ্র রাসূল, বন্ধু ও দাস। তিনি মানবজাতিকে সঠিক পথ দেখিয়ে আল্লাহ্র দেয়া জীবন ব্যবস্থা কায়েম করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর প্রতি অপরাপর নবীগণের প্রতি এবং সমস্ত সাহাবী ও সালেহীনের প্রতি আমার আন্তরিক সালাম।

মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য এবং এ উদ্দেশ্য লাভের সঠিক পন্থাঃ

মহান আল্লাহ বলেনঃ

وَمَا خَلَقْتُ الجن والانس الا لِيَعْبُدُون ما أريدُ مِنْهُمْ مِّن رِزْقِ وَمَا أُرِيدُ أنْ يُطْعِمُونِ

“আমি মানুষ ও জিন জাতিকে শুধু আমার ইবাদাত করার জন্য সৃষ্টি করেছি। আমি তাদের নিকট কোন রিষ্ক চাই না এবং কোন কিছু খেতেও চাই না।” (সূরা আয্ যারিয়াত: ৫৬-৫৭)

এই আয়াত থেকে প্রমাণিত হয় যে, জিন ও মানুষকে শুধু আল্লাহ্র ইবাদাতের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। কাজেই সৃষ্টির এই উদ্দেশ্যের প্রতি বিশেষ লক্ষ্য রাখা মানুষ ও জিন জাতির অপরিহার্য কর্তব্য। দুনিয়ার সুখ-শান্তি ও ভোগবিলাসের পেছনে ছুটে চলা তাদের উচিত নয়। কারণ এ দুনিয়া অস্থায়ী। এটা চিরকাল থাকবার জায়গা নয়। এখান থেকে প্রত্যেককে চলে যেতে হবে । অতএব যারা নিজেদের জীবন আল্লাহ্র ইবাদাতে ও আনুগত্যে কাটিয়ে দেন তাঁরাই সতর্ক, যাঁরা সততা ও তাকওয়া অবলম্বন করেন তাঁরাই বুদ্ধিমান। দুনিয়ার অস্থায়িত্বের চিত্র আল কুরআনে এভাবে অংকিত করা হয়েছে।

মহান আল্লাহ বলেন:

انَّمَا مَثَلُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا كَمَا أَنْزَلْنَاهُ مِنَ السَّمَاء فَاخْتَلَطَ بِهِ نَبَاتُ الْأَرْضِ مِمَّا يَأْكُلُ النَّاسُ والْأَنْعَامُ حَتَّى إذا أخذت الْأَرْضِ زُخْرُفَهَا وَازْيَّنَتْ وَظَنَّ أَهْلَهَا أَنَّهُمْ قَدِرُونَ عَلَيْهَا أَنَّهَا أَمْرُنَا لَيْلاً أَوْ نَهَارًا فَجَعَلْنَهَا حَصِيْدًا كَأَنْ لَمْ تَغْنَ بِالْأَمْسِ كَذَلِكَ نُفَصِلُ الْأَنْتِ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ


“দুনিয়ার জীবনের দৃষ্টান্ত তো এরূপ যে, আমি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করলাম। সেই পানির সাহায্যে জমির গাছপালা, যা মানুষ ও পশুরা খায়, বেশ ঘন হয়ে উঠল, এমনকি যখন সেই জমি পূর্ণ সজীবতাপ্রাপ্ত হয়ে বেশ সুসজ্জিত ও সুশোভিত হয়ে উঠল, আর জমির মালিকরা ভাবল যে, তারা এখন ঐ জমি নিজেদের আয়ত্তাধীন করে ফেলেছে, ঠিক এই সময় কোন রাত অথবা দিনে আমার কোন ধ্বংসত্মক হুকুম হল। তারপর আমি সেগুলো এমন শুকনো খড়ে পরিণত করলাম যেন তা গতকালও সেখানে ছিল না। এভাবে আমি চিন্তাশীলদের জন্য নিদর্শনগুলো পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করছি।” (সূরা ইউনুস : ২৪)

কবি বলেন:

“আল্লাহ্ অসংখ্য বান্দা তারা দুনিয়ার সাথে ছিন্ন করেছেন সম্পর্ক আর আশংকা করেছেন বিপর্যয়ের, গভীর পর্যবেক্ষণের পর জানলেন, এ জগত মানুষের চিরস্থায়ী বাসস্থান নয়, গভীর সমুদ্র জ্ঞানে ভাসালেন জগতের বুকে তাদের সৎ ও সত্যনিষ্ঠ আমলের তরী ।”

দুনিয়ার স্থায়িত্ব ও অস্থায়িত্বের এই অবস্থার প্রেক্ষিতে আমাদের সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য আমি বর্ণনা করেছি। এখন প্রত্যেক বুদ্ধিমান ব্যক্তির কর্তব্য হচ্ছে নিজেকে সৎ লোকদের পথে চালিত করা এবং সঠিক বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন ব্যক্তিগণের পথ অবলম্বন করা। এছাড়া যে বিষয়গুলোর প্রতি আমি ইংগিত করেছি এবং যে উদ্দেশ্য আমি স্মরণ করিয়ে দিয়েছি তার জন্য গুরুত্ব সহকারে প্রস্তুতি গ্রহণ করা উচিত। এজন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য ও অনুসরণই হচ্ছে একমাত্র সঠিক পন্থা।

মহান আল্লাহ বলেন :

وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقوى- (المائدة : ۲)

“সৎ কাজে ও আল্লাহ ভীতির ব্যাপারে তোমরা পরস্পর সহযোগিতা কর।” (সূরা আল মায়িদা : ২)

একটি সহীহ হাদীসে বর্ণিত আছে :

واللَّهُ فِي عَوْنِ الْعَبْدِ مَا كَانَ الْعَبْدُ فِي عَوْنِ أَخِيهِ .

“যতক্ষণ একজন বান্দা তার অপর ভাইকে সাহায্য করতে থাকে, ততক্ষণ আল্লাহও তাকে সাহায্য করতে থাকেন।” (মুসলিম, নাসাঈ ও তিরমিযী)

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আরও বলেছেন :

مَنْ دَلَّ عَلَى خَيْرٍ فَلَهُ مِثْلُ أَجْرِ فَاعِلِهِ -

“যে ব্যক্তি কোন কল্যাণের পথ দেখায়, তদনুযায়ী যে কাজ হবে তার সাওয়াব সেও পাবে।” (মুসলিম, আবু দাউদ)

তিনি আরও বলেছেন :

مَنْ دَعَا إِلى هُدًى كَانَ لَهُ مِنَ الْأَجْرِ مِثْلُ أَجُوْرِ مَنْ تَبعَهُ لا يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ أَجُورِهِمْ شَيْئًا .

“যে ব্যক্তি হিদায়াতের আহ্বান জানাবে, সে হিদায়াত অনুসরণকারীর সমান সাওয়াব পাবে। এ দু'জনের কারও সাওয়াবেই কমতি হবে না। ”

তিনি আলী (রাঃ)-কে বলেছেন:

فَوَ الله لَأَنْ يُهْدِيَ اللهُ بِكَ رَجُلاً وَاحِدًا خَيْرٌ لَكَ مِنْ حُمْرِ النَّعَمِ .

“আল্লাহর শপথ! যদি তোমার দ্বারা আল্লাহ এক ব্যক্তিকেও হিদায়াত দান করেন, তবে এটা তোমার জন্য লাল উট (এটা সবচেয়ে মূল্যবান) অপেক্ষা উত্তম।” (বুখারী, মুসলিম)

আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সহীহ হাদীসগুলো সংক্ষেপে সংকলন করার ইচ্ছা করলাম। পাঠকের জন্য এ সংকলনের মাধ্যমে আখিরাতের পথ সুগম হবে। এর দ্বারা বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ গুণাবলী অর্জিত হবে। এতে থাকবে আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্যের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টিকারী হাদীস এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির সর্বপ্রকার নিয়ম, পদ্ধতি ও কর্মসূচীসহ কুপ্রবৃত্তি দমনের সাধনা ও চারিত্রিক সংশোধন সম্পর্কিত হাদীসসমূহ।


আমি এ গ্রন্থে বিশেষ সতর্কতার সাথে বিখ্যাত হাদীস গ্রন্থগুলো থেকে কেবল সহীহ হাদীসসমূহই সন্নিবেশিত করেছি। এ গ্রন্থের অধ্যায় ও অনুচ্ছেদগুলো আল কুরআনের আয়াত দিয়ে শুরু করেছি । তারপর হাদীস বর্ণনা করেছি।

আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, এ গ্রন্থখানা পাঠককে সততা, নেক ও কল্যাণের দিকে ধাবিত করে তাকে গুনাহ ও ধ্বংস থেকে রক্ষা করবে। যারা এই গ্রন্থ থেকে উপকৃত হবেন, তাঁদের কাছে আমার আবেদন, তাঁরা যেন আমার জন্য, আমার পিতা-মাতা, শিক্ষক, বন্ধু ও সমস্ত মুসলিমের জন্য দোয়া করেন। মেহেরবান আল্লাহ্র উপর আমার ভরসা। তিনিই আমার জন্য যথেষ্ট। তাঁর প্রতি আমার দৃঢ় বিশ্বাস। তিনিই সর্বোত্তম সাহায্যকারী ও সমাধানকারী। মহান আল্লাহ ছাড়া আর কেউ অসৎ পথ থেকে সরিয়ে সৎ পথে নিয়ে আসার শক্তি রাখে না। অতএব তাঁরই নিকট আমি সবকিছু সোপর্দ করছি।

#মুহাম্মদের_বাণী #ইসলামিক_একাডেমি_এনপি #হে_মুমিনগণ! #ইবনে_মাজাহ  #হাদীস_বিশ্ব_নবীর_বাণী  #সুনানে_ইবনে_মাজাহ #রিয়াদুস_সালেহীন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default